সরস্বতীপুজো আর কুল-আজকের প্রজন্মের কাছে কতটা প্রাসঙ্গিক এই রীতি?

সরস্বতীপুজো

"কুল" কারও কাছে শুধুই একটা ফল নয়, বরং শৈশবের গন্ধমাখা স্মৃতি। আবার কারও কাছে একেবারেই অচেনা নাম। সময় বদলেছে, সঙ্গে বদলেছে স্বাদ-অভ্যাসও। এক সময় সরস্বতীপুজো মানেই ছিল কুল না খাওয়ার কঠোর নিয়ম, আর আজ সেই রীতির গুরুত্ব নিয়ে উঠছে প্রশ্ন আদৌ কি এই প্রথা আজকের প্রজন্মের কাছে ‘কুল’?

এক সময় বাজার মানেই ছিল টক-মিষ্টি দেশি টোপাকুল। এখন সেখানে জায়গা করে নিয়েছে চকচকে হাইব্রিড কুল কোনওটা দেখতে সবুজ আপেলের মতো, কোনওটা আবার চেরির আদলে। ফলের ঝাঁকজমক বাড়লেও হারিয়ে যেতে বসেছে দাঁত কাঁপানো দেশি স্বাদ। নারকেল কুল বা টোপাকুল খুঁজতে গেলে দাম আকাশছোঁয়া, আর স্বাদও আগের মতো নয়। অথচ সেই অনিশ্চিত টক-মিষ্টির মধ্যেই লুকিয়ে ছিল কুল খাওয়ার আসল আনন্দ যা হাইব্রিড কুলে আর পাওয়া যায় না।

দেশি টোপাকুল

লোকবিশ্বাস অনুযায়ী, সরস্বতীপুজোর আগে কুল খেলে পরীক্ষায় বিপদ! তাই স্কুলের বাইরে কুলে নুন-লঙ্কা, কাসুন্দি মাখানো দেখেও অনেকেই সাহস করেন না। মনের মধ্যে ভেসে ওঠে মা-ঠাকুমার বারণ, সঙ্গে অজানা ভয় যদি ফেল করি! এই ভয়-ভক্তির মিশেলেই কুল আর সরস্বতীপুজোর সম্পর্ক এত গভীর।

এই রীতির পিছনে রয়েছে লোককথাও। শোনা যায়, মহামুনি ব্যাসদেব এক সময় দেবী সরস্বতীর নির্দেশে তপস্যা শুরু করেছিলেন। একটি কুলবীজ রেখে বলা হয়েছিল, সেই বীজ থেকে গাছ হয়ে পাকা কুল মাথায় পড়ার দিনই তপস্যা ভঙ্গ হবে। কথিত আছে, বসন্ত পঞ্চমীতেই সেই ঘটনা ঘটে। সত্য-মিথ্যার বিতর্ক থাকলেও, গল্পটা প্রজন্মের পর প্রজন্মে রয়ে গিয়েছে।

মহামুনি ব্যাসদেব

তবে আজকের কিশোর-কিশোরীদের অনেকের কাছেই কুল বিশেষ আকর্ষণীয় নয়। কেউ কেউ কুলের গন্ধ বা স্বাদই পছন্দ করে না। আবার কেউ লোভ পেলেও বাড়ির কড়া নিষেধে মুখে তোলে না। অন্য দিকে, অনেক প্রাপ্তবয়স্কের কাছে কুল মানেই শৈশব মায়ের বানানো আচার, রোদে দেওয়া বয়াম, পাহারায় বসে থাকা, আর পুজোর পর সেই নিষিদ্ধ স্বাদের অপেক্ষা।

কেউ নিয়ম ভেঙে ছোটবেলায় চুপিচুপি কুল খেয়েছে, কেউ আবার আজও নিয়ম মেনে চলে। কারও কাছে কুল মানে শুধু আচার, কারও কাছে এক টুকরো স্মৃতি। কিন্তু একটা বিষয় স্পষ্ট আজকের প্রজন্মের ফলের তালিকায় কুল অনেকটাই পিছিয়ে। অ্যাভোকাডো, কিউয়ি, ড্রাগনফ্রুটের ভিড়ে কুল এখন প্রায় শুধু উৎসবের অনুষঙ্গ।

প্রশ্ন থেকেই যায় এই রীতি কি শুধু নস্টালজিয়ার মধ্যেই আটকে থাকবে? নাকি কোনও এক দিন আবার নতুন প্রজন্মের হাতে ফিরে পাবে বাঙালির নিজস্ব এই টক-মিষ্টি ফলের কদর? ব্লুবেরি আর স্ট্রবেরির ভিড়ে কুল কি আবার নিজের জায়গা করে নিতে পারবে? উত্তর সময়ই দেবে।

Category