সময়ের সঙ্গে সঙ্গে উৎসবও বদলায়। তার স্পষ্ট ছবি মিলছে বসন্ত পঞ্চমীর সকালে। এক সময় যে সরস্বতীপুজো ছিল পুরুষ পুরোহিতনির্ভর, আজ সেখানে নেতৃত্বে উঠে আসছেন মেয়েরাই। স্কুল-কলেজে বিদ্যার দেবীর আরাধনায় ক্রমশ সামনের সারিতে ছাত্রীরা।
বাংলার সরস্বতী মূলত বিদ্যা ও বুদ্ধির প্রতীক। তাই তাঁর পুজোর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে বই, খাতা, দোয়াত-কলম, বাদ্যযন্ত্র কিংবা নৃত্যের ঘুঙুর। মাঘের শীতল সকাল বাসন্তী রঙে রাঙা হয়ে ওঠে ছাত্রছাত্রীদের উপস্থিতিতে। দীর্ঘদিন ধরে এই পুজো হয়ে এসেছে পুরুষ পুরোহিতের মন্ত্রোচ্চারণে। অথচ দেবী নিজেই নারী এই প্রশ্নটাই এক সময় উঠেছিল নতুন প্রজন্মের মনে।
২০০৬ সালে পুরুলিয়ার নিস্তারিণী মহিলা মহাবিদ্যালয়ে প্রথমবার সরস্বতীপুজোর পৌরোহিত্য গ্রহণ করেন ছাত্রীরা। সেই বছর থেকেই সেখানে আর কোনও পুরুষ পুরোহিত পুজো করেননি। ছাত্রীদের হাতেই দেবীর আরাধনা চলছে টানা ১৮ বছর। কলেজ সূত্রে জানা যায়, তৎকালীন অধ্যক্ষ নীলিমা সিংহ ও অধ্যাপক ইন্দ্রাণী দেবের উদ্যোগেই শুরু হয় এই প্রথা। জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে যে কোনও আগ্রহী ছাত্রী এখানে পৌরোহিত্য করতে পারেন শর্ত একটাই, মন্ত্রে নিষ্ঠা ও শ্রদ্ধা।
প্রথম দিকে পুরুলিয়া রামকৃষ্ণ মিশনের সহায়তায় প্রশিক্ষণ দেওয়া হত। পরে দায়িত্ব নেন পৌরোহিত্য বিশেষজ্ঞ ধনঞ্জয় ভট্টাচার্য। বাছাই করা ছাত্রীরা মূল পুজো, হোমযজ্ঞ, নৈবেদ্য ও পুষ্পাঞ্জলি সম্পন্ন করেন নিজেরাই। বর্তমান অধ্যক্ষা অজন্তা দাস জানান, এই ধারাবাহিকতা বজায় রাখাই তাঁদের লক্ষ্য।
এই পরিবর্তন শুধু পুরুলিয়াতেই সীমাবদ্ধ নয়। হাওড়ার বালিতে বঙ্গশিশু বালিকা বিদ্যালয়েও কয়েক বছর ধরে ছাত্রীরাই সরস্বতীপুজোর দায়িত্বে। এখানকার পুজোয় সংস্কৃত মন্ত্রের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে তার বাংলা ব্যাখ্যা, উপনিষদের স্তোত্র ও রবীন্দ্রনাথের গান। স্কুল কর্তৃপক্ষের মতে, শিক্ষার প্রকৃত অর্থ এখানেই বোঝা ও অনুভব করা।
আলিপুরদুয়ার নিউ টাউন গার্লস স্কুলেও ভাঙা হয়েছে চিরাচরিত রীতি। নির্বাচিত কয়েক জন ছাত্রী এবার পুরোহিতের ভূমিকায়। স্কুলের প্রধানশিক্ষিকার কথায়, মেয়েরা যদি দেবীকে পুজো দেয়, তাতে বাধা নয় বরং উৎসাহই দেওয়া উচিত।
কলকাতার যোগমায়াদেবী কলেজে আবার ছাত্রীরা অনুরোধ করেছিলেন তাঁদের প্রিয় সংস্কৃত শিক্ষিকাকে পৌরোহিত্য করার জন্য। সেই অনুরোধ ফেলতে পারেননি তিনি। কয়েক বছর ধরে তিনিই মন্ত্রোচ্চারণে ছাত্রীদের সঙ্গে দেবীর আরাধনায় অংশ নিচ্ছেন। তাঁর মতে, এটা শুধু পুজো নয় এ এক সামাজিক পরিবর্তনের প্রতীক।
মাঘ মাসের শুক্ল পঞ্চমীতে শুভ্রবসনা দেবীর সামনে দাঁড়িয়ে আজ মেয়েরাই প্রমাণ করছেন জ্ঞানারাধনায় কোনও লিঙ্গভেদ নেই। পরিবর্তনের এই যাত্রা ধীর হলেও তার গতি অপ্রতিরোধ্য। যেন বিদ্যার দেবী নিজেই মৃদু হাসিতে আশীর্বাদ জানাচ্ছেন নতুন সময়কে।
- Log in to post comments