দশকের পর দশক ধরে কঠোর জন্মনিয়ন্ত্রণ নীতির জন্য চিন বিশ্বজুড়ে পরিচিত ছিল। কুখ্যাত ‘এক সন্তান নীতি’র মাধ্যমে জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে সাফল্য এলেও সময়ের সঙ্গে পরিস্থিতি সম্পূর্ণ উল্টে গিয়েছে। এখন জনসংখ্যা হ্রাস ও দ্রুত বার্ধক্যের চাপে পড়ে ভিন্ন পথে হাঁটছে বেজিং। তারই ইঙ্গিত মিলল সাম্প্রতিক সিদ্ধান্তে—চিনে কন্ডোম ও গর্ভনিরোধক ওষুধের দাম বাড়ানো হয়েছে।
চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে গর্ভনিরোধক সামগ্রী ও ওষুধের উপর দীর্ঘদিনের করছাড় তুলে নিয়েছে চিন সরকার। এর ফলে কন্ডোম ও বার্থ কন্ট্রোল পিলের উপর ১৩ শতাংশ ভ্যাট আরোপ করা হয়েছে। সরকারি মহলের মতে, সন্তান না নেওয়ার প্রবণতা থেকে মানুষকে ধীরে ধীরে সরিয়ে আনতেই এই পদক্ষেপ। যদিও এই সিদ্ধান্ত ঘিরে দেশজুড়ে বিতর্ক শুরু হয়েছে।
গত কয়েক বছর ধরেই চিনের জনসংখ্যা ধারাবাহিকভাবে কমছে। ২০২৪ সাল পর্যন্ত টানা তিন বছর জনসংখ্যা হ্রাস পেয়েছে বলে সরকারি পরিসংখ্যান জানাচ্ছে। বর্তমানে দেশের মোট জনসংখ্যার ২০ শতাংশেরও বেশি ৬০ বছরের ঊর্ধ্বে। রাষ্ট্রসঙ্ঘের পূর্বাভাস অনুযায়ী, আগামী কয়েক দশকে এই হার আরও বাড়বে। ফলে আশঙ্কা বাড়ছে যে চিন ধনী হওয়ার আগেই প্রবীণ সমাজে পরিণত হবে, যার সরাসরি প্রভাব পড়বে শ্রমশক্তি, সরকারি ব্যয় এবং সামগ্রিক অর্থনীতির উপর।
চিনের জন্মহার ইতিমধ্যেই বিশ্বের সর্বনিম্নগুলির মধ্যে একটি। ২০২১ সালে মোট প্রজনন হার নেমে আসে প্রায় ১.১৬-এ, যেখানে জনসংখ্যা স্থিতিশীল রাখতে প্রয়োজন ২.১। ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে এক সন্তান নীতি বাতিলের এক দশক পূর্ণ হবে। যদিও পরে দুই ও তিন সন্তানের অনুমতি দেওয়া হয়েছে, তাতে প্রত্যাশিত ‘বেবি বুম’ দেখা যায়নি। বরং দেরিতে বিয়ে, ছোট পরিবারে অভ্যস্ততা এবং অতীতের কঠোর নীতির স্মৃতি এখনও সমাজে গভীর প্রভাব রেখে গিয়েছে।
অন্যদিকে, উচ্চ বাড়িভাড়া, ব্যয়বহুল শিশু পরিচর্যা ও শিক্ষা, চাকরির অনিশ্চয়তা সব মিলিয়ে সন্তান নেওয়া তরুণ প্রজন্মের কাছে বড় ঝুঁকি হয়ে উঠেছে। গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, আয়ের তুলনায় সন্তান প্রতিপালনের খরচের দিক থেকে চিন বিশ্বের সবচেয়ে ব্যয়বহুল দেশগুলির অন্যতম। পাশাপাশি বিয়ের হারও দ্রুত কমছে। ২০১৩ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে নথিভুক্ত বিয়ের সংখ্যা প্রায় ৪০ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে।
শহুরে তরুণদের মধ্যে ‘ডিঙ্ক’ বা ডাবল ইনকাম, নো কিডস জীবনধারা ক্রমেই সামাজিক স্বীকৃতি পাচ্ছে। সাম্প্রতিক সমীক্ষায় দেখা গিয়েছে, ১৮ থেকে ৩১ বছর বয়সিদের বড় অংশই সন্তান নিতে অনিচ্ছুক। অর্থনৈতিক চাপ, কর্মক্ষেত্রে অনিশ্চয়তা এবং নারীদের উপর শিশু পালনের অসম দায়িত্ব এই সিদ্ধান্তের মূল কারণ।
বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, গর্ভনিরোধকের দাম বাড়ালেই জন্মহার বেড়ে যাবে এমনটা ভাবার কারণ নেই। তবে এটাও স্পষ্ট, জনসংখ্যা সংকট মোকাবিলায় চিন সরকার যে দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে চাইছে, এই সিদ্ধান্ত তারই প্রতীকী ইঙ্গিত। বাস্তবে এর প্রভাব কতটা পড়বে, সেটাই এখন দেখার।
- Log in to post comments