যৌ/ন অপরাধের টাকায় গড়া সাম্রাজ্য: সাড়ে পাঁচ হাজার কোটির এপস্টিন সম্পদের আসল উত্তরাধিকারী কে? ন্যায় পাবে তো নি/র্যাতিতারা?

যৌ/ন অপরাধের টাকায় গড়া সাম্রাজ্য: সাড়ে পাঁচ হাজার কোটির এপস্টিন সম্পদের আসল উত্তরাধিকারী কে? ন্যায় পাবে তো নি/র্যাতিতারা?

যৌন অপরাধে দোষী সাব্যস্ত মার্কিন ধনকুবের জেফ্রি এপস্টিনের মৃত্যু হলেও তাঁকে ঘিরে বিতর্ক আজও থামেনি। বরং সাম্প্রতিক সময়ে প্রকাশ্যে আসা ‘এপস্টিন ফাইলস’ নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে কী ভাবে গড়ে উঠেছিল তাঁর বিপুল সম্পত্তি, কার হাতে যাওয়ার কথা ছিল সেই অর্থ এবং এপস্টিনের হাতে নির্যাতিত নারীরা শেষ পর্যন্ত আদৌ ন্যায় ও ক্ষতিপূরণ পাবেন কি না।

২০০৮ সালে প্রথম বার গ্রেফতার হয়েছিলেন জেফ্রি এপস্টিন। অভিযোগ ছিল, এক নাবালিকাকে যৌন কাজে বাধ্য করা। সে সময় তিনি ১৮ মাস জেল খেটে মুক্তি পান। কিন্তু বিতর্ক থামেনি। ২০১৯ সালে আবারও তাঁকে গ্রেফতার করা হয় নাবালিকাদের যৌন নিগ্রহ ও পাচারের অভিযোগে। ওই বছরই নিউ ইয়র্কের একটি কারাগারে তাঁর মৃত্যু হয়। সরকারি ভাবে বলা হয় আত্মহত্যা, যদিও তা নিয়ে আজও নানা প্রশ্ন রয়েছে।

এপস্টিনের মৃত্যুর ঠিক দু’দিন আগে একটি গুরুত্বপূর্ণ আইনি নথিতে সই করেছিলেন তিনি। সেই নথিই ছিল তাঁর শেষ ইচ্ছাপত্র বা ট্রাস্ট। ‘১৯৫৩ ট্রাস্ট’ নামে পরিচিত এই নথিতে বিস্তারিত ভাবে লেখা ছিল, তাঁর মৃত্যুর পর বিপুল সম্পত্তি কারা পাবেন এবং কী ভাবে তা বণ্টন করা হবে।

২০১৯ সালে মৃত্যুর সময় এপস্টিনের মোট সম্পদের মূল্য ছিল আনুমানিক ৬০ কোটি ডলার ভারতীয় মুদ্রায় প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার কোটি টাকা। এই বিপুল সম্পত্তির মধ্যে ছিল নিউ ইয়র্কের আপার ইস্ট সাইডে বিলাসবহুল টাউনহাউস, ফ্লোরিডার পাম বিচে বাড়ি, নিউ মেক্সিকোর জোরো র‍্যাঞ্চ, প্যারিসের সম্পত্তি এবং মার্কিন ভার্জিন দ্বীপপুঞ্জের কুখ্যাত ‘লিটল সেন্ট জেমস’ দ্বীপ যা বিশ্বজুড়ে ‘পেডো আইল্যান্ড’ নামে পরিচিত।

ট্রাস্ট অনুযায়ী, এপস্টিনের সম্পদের সবচেয়ে বড় অংশ পাওয়ার কথা ছিল তাঁর শেষ জীবনের ঘনিষ্ঠ সঙ্গী ক্যারিনা শুলিয়াকের। বেলারুশের বাসিন্দা শুলিয়াক ২০০৯ সালে মাত্র ২০ বছর বয়সে আমেরিকায় আসেন। তিনি তখন দন্তচিকিৎসার ছাত্রী ছিলেন। তাঁর পড়াশোনার খরচ, চিকিৎসা এবং পরিবারের আর্থিক ব্যয় বহন করতেন এপস্টিন বলেই নথিতে উল্লেখ রয়েছে।

এপস্টিন নাকি শুলিয়াককে বিয়ে করার কথাও ভেবেছিলেন। ট্রাস্টে লেখা ছিল, শুলিয়াক এককালীন প্রায় ১০ কোটি ডলার পাবেন এবং তার পাশাপাশি প্রতি বছর বিপুল অঙ্কের ভাতা দেওয়া হবে। নগদ অর্থ ছাড়াও একাধিক মূল্যবান সম্পত্তির মালিকানা তাঁর হাতে তুলে দেওয়ার পরিকল্পনা ছিল।

শুধু শুলিয়াকই নন, ট্রাস্টে এপস্টিনের ভাই মার্ক এপস্টিন, দীর্ঘদিনের আইনজীবী ড্যারেন ইন্ডিক এবং হিসাবরক্ষক রিচার্ড কান-এর নামও ছিল। ইন্ডিক ও কানকে এস্টেটের সহ-নির্বাহী হিসাবে মনোনীত করা হয়। তাঁদের জন্য আলাদা করে কোটি কোটি ডলার বরাদ্দ ছিল।

এপস্টিনের দীর্ঘদিনের সহযোগী ও পরে দোষী সাব্যস্ত গিজ়লাইন ম্যাক্সওয়েলের নামও ট্রাস্টে অন্তর্ভুক্ত ছিল। উল্লেখ্য, ম্যাক্সওয়েল বর্তমানে নাবালিকাদের যৌন নির্যাতনের ষড়যন্ত্রে দোষী সাব্যস্ত হয়ে ২০ বছরের সাজা ভোগ করছেন।

তবে এপস্টিনের মৃত্যুর পর বাস্তব পরিস্থিতি বদলে যায়। কর সংক্রান্ত জটিলতা, একাধিক মামলা এবং সর্বোপরি নির্যাতিতদের ক্ষতিপূরণ দিতে গিয়ে এস্টেটের বড় অংশ আটকে যায়। এপস্টিনের হাতে যৌন নির্যাতনের শিকার শতাধিক নারীর জন্য একটি ক্ষতিপূরণ কর্মসূচি চালু করা হয়, যার মাধ্যমে প্রায় ১২ কোটি ডলারেরও বেশি অর্থ প্রদান করা হয়েছে।

আদালতের সাম্প্রতিক হিসাব অনুযায়ী, বর্তমানে এপস্টিনের এস্টেটের মূল্য কমে প্রায় ১২ কোটি ডলারে নেমে এসেছে। যদিও কিছু বিনিয়োগের প্রকৃত মূল্য এখনও নির্ধারিত হয়নি। ফলে ভবিষ্যতে সম্পদের অঙ্ক কিছুটা বাড়তেও পারে।

এই গোটা ঘটনাপ্রবাহ নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে যৌন অপরাধের মাধ্যমে অর্জিত সম্পত্তির প্রকৃত নৈতিক অধিকারী কে? আইনত উত্তরাধিকারী নির্ধারিত হলেও, ন্যায়বিচারের দৃষ্টিতে কি নির্যাতিতরাই এই সম্পদের প্রকৃত দাবিদার নন?

এপস্টিন ফাইলস প্রকাশ্যে আসার পর বিশ্বজুড়ে সেই প্রশ্নই আরও জোরালো হচ্ছে।

Category