যুক্তরাষ্ট্রের কুখ্যাত অর্থ বিনিয়োগকারী ও যৌন অপরাধী জেফরি এপস্টেইনকে ঘিরে প্রকাশিত সাম্প্রতিক বিপুল নথিপত্র আবারও বিশ্বজুড়ে আলোড়ন তুলেছে। লাখ লাখ নথি, ছবি ও ই-মেইল প্রকাশের পর প্রশ্ন উঠেছে—যাঁরা এপস্টেইনের পার্টি, ভ্রমণ বা সামাজিক বলয়ে যুক্ত ছিলেন, তাঁরা কি কেবল নৈতিকভাবে দায়ী, নাকি তাঁদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগও রয়েছে?
যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগ স্পষ্ট করেছে কেবল এপস্টেইনের সঙ্গে পার্টিতে যাওয়া বা সামাজিক যোগাযোগ রাখা নিজেই কোনো অপরাধ নয়। ফৌজদারি মামলার জন্য প্রয়োজন কঠোর প্রমাণ: অপরাধে সরাসরি অংশগ্রহণ, জ্ঞাতসারে সহায়তা বা অপরাধ গোপনের প্রমাণ। এই মানদণ্ড পূরণ না হলে মামলা টেকা কঠিন।
তবে এই আইনি যুক্তি ভুক্তভোগীদের ক্ষোভ প্রশমিত করতে পারছে না। কারণ, প্রকাশিত নথিগুলো দেখাচ্ছে ২০০৮-০৯ সালে দণ্ডিত হওয়ার পরও বহু প্রভাবশালী ব্যক্তি এপস্টেইনের সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রেখেছিলেন। এতে সন্দেহ আরও গভীর হয়েছে: এত ক্ষমতাবান ও অভিজ্ঞ মানুষ কি সত্যিই তাঁর অপরাধপ্রবণতা সম্পর্কে কিছুই বুঝতে পারেননি?
নথিপত্র অনুযায়ী, এপস্টেইনের সামাজিক নেটওয়ার্ক ছিল অবিশ্বাস্য রকম বিস্তৃত। সাবেক ও বর্তমান মার্কিন প্রেসিডেন্ট, ইউরোপের রাজপরিবারের সদস্য, মন্ত্রী, কূটনীতিক, শীর্ষ ব্যবসায়ী, প্রযুক্তি উদ্যোক্তা ও তারকারা কোনো না কোনো সময়ে তাঁর যোগাযোগ তালিকায় ছিলেন। নিউইয়র্ক, ফ্লোরিডা কিংবা ব্যক্তিগত দ্বীপে আয়োজিত অনুষ্ঠানগুলো ছিল এই নেটওয়ার্কের কেন্দ্র।
আইনের চোখে সবাই অপরাধী নন। অনেকেই দাবি করেছেন, তাঁরা এপস্টেইনের অপরাধ জানতেন না বা বহু আগেই সম্পর্ক ছিন্ন করেছিলেন। বাস্তবতাও হলো আজ পর্যন্ত তাঁদের বড় অংশের বিরুদ্ধে কোনো ফৌজদারি অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি।
কিন্তু নৈতিক প্রশ্নটি এখানেই শেষ হয় না। যেসব কিশোরীকে প্রলোভন, ভয় কিংবা আর্থিক দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে শোষণ করা হয়েছিল, তাঁদের জীবনে যে ক্ষত তৈরি হয়েছে, তার দায় কি কেবল একজন এপস্টেইনের ওপরই বর্তায়? নাকি তাঁর বলয়ের প্রভাবশালীরাও দায় এড়াতে পারেন না?
ইউরোপে এর প্রতিক্রিয়া আরও তীব্র। যুক্তরাজ্যে সাবেক মন্ত্রী পিটার ম্যান্ডেলসনের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু হয়েছে। রাজপরিবারের সদস্য যুবরাজ অ্যান্ড্রুর বিরুদ্ধে মামলা নিষ্পত্তি হলেও তাঁর রাজকীয় মর্যাদা কেড়ে নেওয়া হয়েছে। নরওয়ের যুবরাজ্ঞী মেত্তে-মারিত প্রকাশ্যে স্বীকার করেছেন—এপস্টেইনের সঙ্গে সম্পর্ক রাখা ছিল বড় ভুল, যার দায় তাঁকে নিতেই হবে।
এই আত্মসমালোচনার জায়গাটিই এখন মূল আলোচনার কেন্দ্র। আইন হয়তো অনেককে ছুঁতে পারবে না, কিন্তু জনসমক্ষে জবাবদিহি, অনুশোচনা ও নৈতিক দায় স্বীকার—এগুলো কি অন্তত হওয়া উচিত নয়?
এপস্টেইন ২০১৯ সালে মারা গেছেন। কিন্তু তাঁর তৈরি করা ক্ষমতা, অর্থ ও নৈতিক অবক্ষয়ের নেটওয়ার্ক এখনো সমাজ ও রাজনীতিকে তাড়া করে বেড়াচ্ছে। ফৌজদারি বিচারের বাইরে থেকেও ইতিহাস একদিন প্রশ্ন তুলবে—ক্ষমতার কাছাকাছি থাকা মানুষরা তখন নীরব কেন ছিলেন?
পার্টিতে যাওয়া হয়তো অপরাধ নয়। কিন্তু সব নীরবতাও যে নির্দোষ, তা নয়।
- Log in to post comments