মালদায় কংগ্রেসে কি সত্যিই ‘মৌসম বদল’? নাকি তৃণমূলের ধাক্কা সামলানোর কৌশল?

মালদায় কংগ্রেসে কি সত্যিই ‘মৌসম বদল’? নাকি তৃণমূলের ধাক্কা সামলানোর কৌশল?

মালদার রাজনীতিতে আবার ফিরেছে পরিচিত এক নাম মৌসম বেনজির নূর। ঠিক সাত বছর আগে যাঁর দলবদল ঘিরে তুমুল বিতর্ক হয়েছিল, তিনিই ২০২৬ বিধানসভা নির্বাচনের মুখে আবার কংগ্রেসে প্রত্যাবর্তন করলেন। ফলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে এই প্রত্যাবর্তন কি মালদায় কংগ্রেসের হারানো জমি ফেরাতে পারবে, নাকি এটি শুধুই আবেগনির্ভর এক রাজনৈতিক চেষ্টা?

২০১৯ সালের জানুয়ারিতে কংগ্রেস ছেড়ে তৃণমূলে যোগ দিয়েছিলেন গনিখান চৌধুরীর ভাগ্নি মৌসম। সেই সময় রাহুল গান্ধী তাঁকে প্রকাশ্যে ‘বিশ্বাসঘাতক’ বলেছিলেন। মৌসমের যুক্তি ছিল, বিজেপির বিরুদ্ধে লড়াইয়ে কংগ্রেস ও তৃণমূলের জোট প্রয়োজন। তবে সেই সমীকরণ বাস্তবে সফল হয়নি। কংগ্রেসের টিকিটে যেভাবে উত্তর মালদা আসনে জয় এসেছিল, তৃণমূলের টিকিটে দাঁড়িয়ে সেই সাফল্য আর ধরা দেয়নি ২০১৯ সালের লোকসভা ভোটে তা স্পষ্ট হয়ে যায়।

এবার ২০২৬ বিধানসভা নির্বাচনের প্রাক্কালে কংগ্রেসে তাঁর প্রত্যাবর্তনকে ঘিরে নতুন করে রাজনৈতিক হিসেবনিকেশ শুরু হয়েছে। প্রদেশ কংগ্রেস নেতৃত্বের বক্তব্যেই স্পষ্ট দল দীর্ঘদিন দরজা খোলা রেখেছিল, এবার সেই দরজা দিয়েই মৌসম ফিরলেন। কিন্তু এই ফেরা কি শুধুই প্রতীকী, নাকি বাস্তবে নির্বাচনী লাভ এনে দিতে পারে?

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে ফিরে তাকাতে হবে মালদার রাজনৈতিক বাস্তবতায়। একসময় গনিখান চৌধুরীর নামেই মালদার রাজনীতি চিনত রাজ্য। সেই আবেগ আজও কতটা কার্যকর, সেটাই বড় প্রশ্ন। ২০০৯ সালে সুজাপুর বিধানসভা উপনির্বাচনে জিতে মৌসমের রাজনীতিতে প্রবেশ। একই বছর উত্তর মালদা লোকসভা আসনে প্রার্থী হয়ে জয়। ২০১৪ সালেও কংগ্রেসের টিকিটে পুনর্নির্বাচিত হন তিনি। এমনকি জেলা কংগ্রেস সভাপতির দায়িত্বও সামলেছেন।

কিন্তু তার পর থেকেই গনি পরিবারের অন্দরে বিভাজন, কংগ্রেস নেতৃত্বের সঙ্গে দূরত্ব এবং প্রকাশ্য অসন্তোষ বাড়তে থাকে। ২০১৯ সালের ঠিক আগে তৃণমূলে যোগদান ছিল সেই টানাপোড়েনের চূড়ান্ত পরিণতি। সে সময় মালদায় তৃণমূলের পর্যবেক্ষক ছিলেন শুভেন্দু অধিকারী যা আজকের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে আলাদা তাৎপর্য বহন করে।

গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, যে জোটের দাবি তুলে মৌসম একসময় কংগ্রেস ছেড়েছিলেন, সেই কংগ্রেস-তৃণমূল সমঝোতা আজও অনিশ্চিত। বরং তৃণমূল নেতৃত্ব স্পষ্ট করে দিয়েছে, পশ্চিমবঙ্গে কংগ্রেসের ওপর তাদের নির্ভরতা নেই। ফলে আসন্ন নির্বাচনে জোটের সম্ভাবনা কার্যত ক্ষীণ।

এদিকে মালদার রাজনৈতিক মানচিত্রও বদলেছে। ২০১৪ সালের পর থেকেই জেলায় তৃণমূল ও বিজেপির প্রভাব বেড়েছে। ২০২১ বিধানসভা নির্বাচনে ১২টি আসনের একটিতেও কংগ্রেস জিততে পারেনি। একসময়ের গনি পরিবারের শক্ত ঘাঁটি সুজাপুর এখন তৃণমূলের দখলে। বৈষ্ণবনগরের মতো এলাকায়ও কংগ্রেস পিছিয়ে পড়েছে।

এই বাস্তবতায় কংগ্রেসের লক্ষ্য খুব বড় নাও হতে পারে। গনি পরিবারের আবেগকে সামনে রেখে যদি দু’একটি আসনও উদ্ধার করা যায়, তাহলেই শূন্যের খাতা খুলবে। মৌসম নিজে প্রার্থী হবেন কি না, আর হলে কোন আসন থেকে সেটাই এখন সবচেয়ে বড় কৌতূহলের বিষয়। কারণ মালদায় কংগ্রেসের সামনে শুধু তৃণমূল নয়, ক্রমশ শক্তিশালী হয়ে ওঠা বিজেপিও বড় চ্যালেঞ্জ।

সব মিলিয়ে বলা যায়, মালদার রাজনীতিতে আবার ‘মৌসম’ ফিরলেও সত্যিই কি হাওয়া বদলাবে তা নির্ভর করবে আবেগ নয়, ভোটের অঙ্কে।

Category